Tuesday, October 31, 2017

প্লাজা-পিয়াজ্জা'র দেশে; পর্ব-১ (প্রস্তুতি)



[জানুয়ারির মাঝামাঝি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকালীন ছুটিতে ১৩ দিনের সফরে গিয়েছিলাম স্পেনের ৪টি শহর (মাদ্রিদ, সেভিল, গ্রানাডা, বার্সেলোনা) এবং ইতালির রাজধানী রোম। যখন ভ্রমণে ছিলাম তখন প্রতিনিয়ত অনুভব করছিলাম ভ্রমণের বিবরণী লেখার। কেননা প্রতিদিন এতো নতুন নতুন জায়গা দেখছিলাম আর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছিলাম যে পরের দিনই আগেরটা বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে ভুলে যাচ্ছিলাম গতকাল কোথায় খেয়েছি, কোথায় গিয়েছি, এটা বা ওটা কোন শহরে ছিল! কিন্তু সময়ের সল্পতা আর নতুনকে দেখার আতিশয্যে তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতাগুলো লেখা হয়নি। তারপরও স্মৃতি হাতড়ে, টিকেট, ভাউচার আর ছবি দেখে এই বর্ণনাটা ভার্চুয়াল জগতের স্মৃতিতে জমা দিলাম। এই প্রত্যাশায় যে, ভার্চুয়াল মাধ্যমের স্থায়িত্ব কাগজের আর মস্তিষ্কের জীবনী থেকে বেশি হবে।]

ব্রিটেনে একটু লম্বা সময়ের জন্য এলে ইউরোপ দেখে যাওয়ার ইচ্ছা খুব কম মানুষই দমাতে পারে। এর একটা বড় কারণ হলো ইউকে থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর জন্য শেনজেন ভিসা পাওয়া যেমন সহজ তেমনি এখান থেকে খুব কম খরচে আর পরিশ্রমে বৈচিত্রপূর্ণ এক মহাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অৰ্জন। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের কোনো দেশে আসতে যে পরিমান অর্থ, সময় আর পরিশ্রম ব্যায় করতে হবে তার সিকি ভাগ দিয়েই ইউরোপ ভ্রমণের এই সুযোগ তাই কেউ ছাড়তে চায় না। এসব হিসাব-নিকাশ তো ছিলই, তার উপর আমার স্বভাবটাও এডভেঞ্চারমুখী। নিজ দেশের ৬৪ টি জেলার মধ্যে ৫৩ টি জেলাতে ইতোমধ্যেই আমি গিয়েছি। গিয়েছি মানে বাসে বা ট্রেনে করে অতিক্রম করেছি তা না, অন্তত একটা রাত কাটিয়েছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের পয়সাতে নয়। আমার চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাকে এই দুর্লভ সুযোগ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। যাক সেসব কথা, ইউরোপ ভ্রমণের বিষয়ে আসি। ইচ্ছা আর সহজ সুযোগ থাকলেই তো আর সব হয় না। অর্থের যোগান থাকতে হয়। এখানে ঘুরে ফিরে দেখার জন্যে কোনো চাকরিদাতা আমাকে স্পনসর করবে না, তাই নিজের জমানো যা ছিল সেটাই সম্বল। তাই আপাতত ইউরোপ ভ্রমণের চিন্তার ফ্রেমটা ছোট করে স্পেন আর ইতালি ভ্রমণে নিবিষ্ট করলাম। এর কারণ দাঁড় করাতে গিয়ে দেখলাম এই দুই দেশের একটি হলো ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনায় ইউরোপের সবচেয়ে বৈচিত্রপূর্ণ দেশ, আরেকটি হলো ইউরোপিও সভ্যতার আদিভূমি (নিজেকে কিছুটা সান্তনা দেবার জন্যে)।






মনে যখন ইচ্ছা চেপে বসেছে তখন তো আর ফেরার উপায় নেই । ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যায়, কিন্তু তাতে নিজের ইচ্ছা মতো সবকিছু হয় না, আর খরচও যায় বেড়ে। আবার দেখলাম শীতকালে ভ্রমণে গেলে সাধারণ সময়ের চেয়ে খরচ প্রায় ৩-৪ গুণ কমানো সম্ভব। শীতকালে ইউরোপের দেশগুলোতে বিমানের ভাড়া, হোটেল বুকিং সবকিছুতেই খরচ কম। অপরদিকে শীতের সময় ইউকেতে তাপমাত্রা (-৭) থেকে (+৩) এর মধ্যে উঠানামা করলেও স্পেন এবং ইতালির ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সেখানে তাপমাত্রা (+৫) থেকে (+১৩) এর মধ্যে থাকে, যা আমাদের বাঙালিদের জন্যে অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে।

যেহেতু আমি কোনো এজেন্সির সহায়তা নেই নি, তাই ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়ে বেশ কিছু বিষয় হাতে-কলমে জানতে পারলাম। এধরণের ব্যক্তিগত পরিকল্পনা করতে গেলে এই তথ্য গুলো অনেকের কাজে লাগতে পারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে ঘুরতে গেলে শেনজেন ভিসা লাগে এটা তো সবারই জানা। কিন্তু ভিসার জন্যে আবেদন করতে হয় সেই দেশের এম্বাসিতে যেখানে ভ্রমণকালীন সবচেয়ে বেশি সময় অবস্থান করা হবে। আর যদি ভ্রমণ পরিকল্পনা এমন হয় যে, কোনো দুটি বা তিনটি দেশে সমান দিন অতিবাহিত হবে তাহলে ওই দেশগুলোর মধ্যে যে দেশে প্রথম প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে সে দেশের এম্বাসি থেকে ভিসা নিতে হবে। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করছি। যদি কেউ ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, জার্মানি ৪ টি দেশে যেতে চায় এবং পরিকল্পনা থাকে ইতালিতে বেশি সময় অবস্থান করবে তাহলে ভিসা নিতে হবে ইতালি এম্বাসি থেকে। আবার যদি এমন হয়, স্পেন দিয়ে প্রবেশ করে স্পেন, ফ্রান্স এই দুটি দেশে সবচেয়ে বেশি সময় এবং সমান সংখ্যক দিন অতিবাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাহলে ভিসা নিতে হবে স্পেন এম্বাসি থেকে। আমরা স্পেন এম্বাসির মাধ্যমে আবেদন করেছিলাম। যেসমস্ত কাগজপত্র লেগেছিলো তার তালিকা মোটামুটি এরকম- পাসপোর্ট, বিআরপি (বায়োমেট্রিক রেসিডেন্সিয়াল পার্মিট), ভ্রমণের টিকিটের কপি, হোটেল বুকিং এর কপি, ভ্রমণ ইন্সুরেন্স (প্রত্যেকের জন্য আলাদা, শিশু থাকলে তার জন্যেও আলাদা, ইউকের পোস্ট অফিসের ওয়েবসাইট এর মাধ্যমে অনলাইনে ভ্রমণ ইন্সুরেন্স করে ফেলা যায়। ভ্রমণ পরিকল্পনাতে স্পেন থাকলে খরচ একটু বেশী পরে, জন প্রতি ১৫-২০ পাউন্ড।), ৩ মাসের ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট (ভিসা আবেদনের পূর্বের সাতদিনের মধ্যে উত্তোলিত হতে হবে), ডিপেন্ডেন্ট থাকলে (স্ত্রীর জন্যে বৈবাহিক সনদ, বাচ্চার জন্যে জন্ম সনদ), বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যয়ন পত্র (যেহেতু আমি ছাত্র। চাকরিজীবী হলে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে প্রত্যয়ন নিতে হবে), সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে পরিচিতি পত্র (এটা জরুরি না, কিন্তু নিজের নিরাপত্তার কারণে নিয়ে রাখা ভালো)।

স্পেন এম্বাসি আমাকে ৫ কর্মদিবসের মধ্যেই ভিসা দিয়ে দিলো। অফপিক সময় হওয়াতে মনে হয় সময় কম লেগেছিলো। এবার যাত্রা শুরুর পালা। যাত্রার দিন ব্রাইটন শহরে তুমুল বৃষ্টি, সেইসাথে ঠান্ডা। ট্রেনে করে যখন গ্যাটউইক এয়ারপোর্টে যাচ্ছি তখন দেখতে পেলাম বরফ পড়তে শুরু করেছে। মনে মনে ভাবলাম যাক তাহলে ইউকে থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্যে সঠিক সময়টাই নির্ধারণ করেছি।



                                                                                                                     [চলবে]... ..

Related Posts

প্লাজা-পিয়াজ্জা'র দেশে; পর্ব-২ (মাদ্রিদ)
প্লাজা-পিয়াজ্জা'র দেশে; পর্ব-৩ (সেভিল)





No comments:

Translate